শনিবার ● ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রথম পাতা » উপ সম্পাদকীয় » মহালয়ার আদ্যপান্ত : ভিন্ন দৃষ্টিকোণ
মহালয়ার আদ্যপান্ত : ভিন্ন দৃষ্টিকোণ
উত্তম কুমার পাল হিমেল,নবীগঞ্জ,হবিগঞ্জ :: শরতের আগমন ইতিমধ্যে অনুভূত হচ্ছে। প্রকৃতির এ চিরচেনা পরিবর্তন ও আমাদের আন্দোলিত করে। কিছুদিন আগে গেল শুভ জন্মাষ্টমী (শ্রীকৃষ্ণেরজন্মতিথি) ও শুভ তালনবমী তিথি (শ্রীশ্রীঠাকুরঅনুকূলচন্দ্রের জন্মতিথি)। দরজায় কড়া নাড়ছে শারদীয় দূর্গোৎসব। শারদীয় দুর্গা উৎসবের আগমনী বার্তাটা হলো শুভ মহালয়ার মাধ্যমে। এদিন ব্রাহ্মণ পূজারী চন্ডিপাঠের মাধ্যম দেবী দূর্গাকে ববাহন করেন। আর এ থেকেই শুরু হয় শরতকালের দুর্গাপূজার মূল প্রস্তুতি।
মহালয়া কি?
শারদীয় দূর্গাপূজার ৭ দিন আগে অতি মাঙ্গলিক একটি অনুষ্ঠান মহালয়া, যা আদি শক্তি মহামায়ার আবির্ভাব এর বার্তা বহন করে। এটা মা দূর্গাকে এ ধরণীতেবআগমনের জন্য একবধরনের আমন্ত্রন জানানো ’জাগোনতুমি জাগো’।. মন্ত্র উচ্চারণ ও ভক্তিমূলক গানের মাধ্যমে তাঁকে আহবান করা হয়।
মহালয়া এত জনপ্রিয় কেন?
বিগত ১৯৩০ সাল, অলইন্ডিয়া রেডিওতে খুব সকালে একটি নতুন অনুষ্ঠান সংযুক্ত হয়। যার নাম ছিল মহিষাসুর মর্দিনী। অলইন্ডিয়া রেডিওয়ের এই অনুষ্ঠানটি ছিল, চন্ডি কাব্যের আবৃত্তি, বাংলা ভক্তি গীতি, শাস্ত্রীয় সংগীত ও অসাধারণ যন্ত্র সংগীতের সমন্বয়। পরবর্তীতে অনুষ্ঠানটি হিন্দীতে অনুবাদ করে, একই সময়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোতে সস্প্রচার করা হয়। আমরা বাংলাদেশে অলইন্ডিয়া রেডিও তথা আকাশবানী থেকেই এ সম্প্রচার শুনে আসছি। মহালয়া বলতে আমরা এখন এই অনুষ্ঠানটিকেই বুঝি। এরা একে অপরের সমার্থক শব্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আজ ৭ যুগ ধরে, আমরা বাঙালী হিন্দুরা মহালয়ার দিন খুব ভোরে, প্রায় সকাল ৪ টার সময় রেডিও টি উনিং করে মহিষাসুর মর্দিনী অনুষ্ঠানের সম্প্রচার শুনি ।বর্তমানে কেন কেন টেলিভিশন চ্যানেলেও মহালয়ার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়ে থাকে।
জাদুকর বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র একজন মানুষ, যিনি চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবেন মহালয়াকে এতটা জনপ্রিয়, হৃদয়গ্রাহী করে তোলার জন্য। মহিষাসুর মর্দিনী অনুষ্ঠানের পেছনে রয়েছে তার জাদুকরী কন্ঠস্বর। এই কিংবদন্তীপবিত্র চন্ডি শ্লোক৷ গুলো আবৃত্তি করেছেন এবং মা দূর্গার এ ধরাধামে আগমনের গল্প বর্ননা করেছেন তার অনন্য বাচন ভঙ্গিতে।
তিনি এ ইহলোক ত্যাগ করেছেন অনেক দিন হয়েছে, কিন্তু এখনো তার রেকর্ডকৃত কন্ঠস্বর মহালয়া অনুষ্ঠানের মূল অংশ জুড়ে রয়েছে। বীরেন্দ্র ভদ্রের জোরালো, গাম্ভীর্যপূর্ণ আবৃত্তি মহালয়ার ২ ঘন্টা আমাদের মধ্যে প্রানচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে, প্রতিটি গৃহবাসী মানুষ স্বর্গীয় এক পরিবেশ অনুভব করে, আমাদের আত্মা কিছু সময়ের জন্য বৈষয়িকতার উর্দ্ধে উঠে পরম শক্তির প্রার্থনায় রত হয়।
এক অনন্য সৃষ্টিকর্ম মহিষাসুরমর্দিনী ভারতীয় শিল্প জগতে এক অতুলনীয় গীতিনাট্য। যদিও এর মূল প্রতিপাদ্য পৌরণিক এবং মন্ত্রগুলো বৈদিক, এই অনুষ্ঠিানটি এক মাইলফলক সৃষ্টিকারী কম্পোজিশন। এর মূলস্ক্রিপ্ট রচনা করেছেন বানী কুমার, আর ধারা বর্ননায় ছিলেন বীরেন্দ্র ভদ্র। অসাধারণ সুরসৃষ্টি ও পরিকল্পনায় ছিলেন অমর সুর¯ শ্রষ্টা পঙ্কজ মল্লিক । গানে কন্ঠ দিয়েছেন যারা,তাদের নতুন করে পরিচয় দেয়াটা ধৃষ্টতা মনে হয়। কালজয়ী সংগীত শিল্পী হেমন্ত কুমার ও আরতি মূখার্জী।
যখন আবৃত্তি শুরু হয়, সকালের প্রশান্ত বায়ু যেন স্পন্দিত হতে থাকে শঙ্খের দীর্ঘ সুরধ¦নিতে। সাথে সাথে সম্মিলিত কন্ঠে আবৃত্তি, আবহ তৈরি হয় চন্ডী শ্লোক উচ্চারণ।
মহিসাসুর মর্দিনীর কাহিনী
এ গল্পের কাহিনী বেশ আকর্ষণীয়। শুরুতে দেবতাদের প্রতি অসুর রাজ মহিষাসুরের ক্রমবর্দ্ধমান নিষ্ঠুরতার বর্ননা দেয়া হয়। তার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন কিভাবে মহিষাসুরকে দমন করে সত্য ও ন্যায়প্রতিণ্ঠা করা যায় এ আলোচনায়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের (শিব) মিলিত তেজে আবির্ভূত হল এক নারী, যার দশানন। তিনিই দশভূজা, দূর্গতি নাশিনী দূর্গা। তিনিই মহাবিশ্বে আদ্যাশক্তি রুপে আর্বিভূত।
অন্যান্য দেবতারা আর্শিবাদ ও স্ব-স্ব অস্ত্র দিয়ে পরিপূর্ণ করলো মহামায়াকে। রণসাজে সজ্জিত হয়ে, সিংহবাহনে চড়ে দেবী যুদ্ধ শুরু করলেন মহিষাসুরের সাথে । ভয়ংকর যুদ্ধের মাধ্যমে দেবী মহিষাসুরকে তাঁর ত্রিশুল দিয়ে৷ বধ করলেন। স্বর্গ ও মর্ত্যধাম এ বিজয়ে ধন্য ধন্য করতে লাগলে। পরিশেষে, মন্ত্র উচ্চারণ সমাপ্তি হয় মহাশক্তির নিকট আমাদের সকল প্রার্থনা নিবেদন। সকলের প্রতি আমার বিণীত অনুরোধ, উৎসব মানেই আনন্দ। তাই শারদোৎসব ও হবে আনন্দময়। কিন্তু মাতৃ আরাধনার নামে আমি যেন কোন বোনকে, মা’কে অপমানিত না করি। মাতৃ আরাধনা যেন নারীকে শ্রদ্ধা ও তার যোগ্য মর্যাদা দেওয়ার চিরায়ত বৈদিক ও পৌরণিক শিক্ষা আমাদের মধ্যে জাগ্রত করে। তাই আমাদের প্রতিটি মা যেন সত্যিকারের দূর্গা গুণ সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে, তারা যেন তাদের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারে ছেলেদের মতো,তা যেন প্রতিটা ভাই ও বাবা-মা’রা গুরুত্ব দিয়ে উপলব্দি করেন। নিজের স্ত্রী’কে, বোন’কে, মা’কেসামগ্রিক অর্থে একজন নারীকে পূর্ণ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শণ করার শিক্ষালাভ করতে না পারলে এ মাতৃ সাধনা বাঁদরের তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।
আসুন, আমাদের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা পূর্বা পর আর্য্য ঋষিদের জাগিয়ে তুলি।আমরা ঋষি ভরদ্বাজ, শান্ডিল্য, আলম্বায়ন, মৌদগৈল্য, কাশ্যপ ঋষির রক্ত ধারা। যা আজো আমরা গোত্র-প্রবর নামে ধারণ করে আছি। আমরাই একদিন পৃথিবীকে সত্য, ন্যায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথ দেখিয়েছিলাম। আজ আমরা কোথায়? কোন পথে চলেছি? এখনও সময় আছে মিথ্যা জ্ঞানাভিমান ছুড়ে ফেলে দিয়ে বর্তমান যুগোপুরুষোত্তমে আশ্রয় নিয়ে আবা রনিজেদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করব আর্য্য সমাজ, মানবতার সমাজ। যেইবানীএকদিন ধ্বনিত হয়েছে বেদে, গীতায়, কোরাণে, বাইবেলে, ত্রিপিটকে, আজো সেইবাণী ধ্বণিত হচ্ছে।
আমরা আর্য্য সন্তানেরা হীনমণ্য নই, তাই সকলের জন্য প্রার্থনায় আমাদের কোন জড়তা নেই। সবাই সুখী হোক, সত্য-সুন্দরের পথে চলুক, পরমপিতার কাছে শারদোৎসবে এই প্রার্থনা।
লেখক : উত্তম কুমার পাল হিমেল
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ
নবীগঞ্জ, উপজেলা শাখা, হবিগঞ্জ।





নিখোঁজ শিশুর অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎ : আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা জরুরী
কৃষকের যত চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের ঘোষিত ছয় অগ্রাধিকার
নেপালের বন্যা: সীমান্তের ঊর্ধ্বে এক সংকট
জলবায়ু পরিবর্তনের অদৃশ্য সংকট ও পরিণতি
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা : সামাজিক বাস্তবতা ও উত্তরণের পথ
স্বাধীন রাজনৈতিক শ্রেণী হিসাবেই শ্রমিকশ্রেণীকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে : বহ্নিশিখা জামালী
গৌতম বুদ্ধের প্রধান তিনটি ঘটনাকে বুদ্ধ পূণিমা অভিহিত করা হয়
বাঙ্গালির জীবনে বাংলা নববর্ষ ও কিছুকথা