শনিবার ● ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৬
প্রথম পাতা » উপ সম্পাদকীয় » ১৯২৬ সালে শহীদ বেদীর রূপকল্প দিয়েছিলেন কবি নজরুল
১৯২৬ সালে শহীদ বেদীর রূপকল্প দিয়েছিলেন কবি নজরুল

এইচ.এম সিরাজ :: সে দিন হঠাৎ মনে হলো, বইমেলায় আর যাবোনা ; বইমেলায় যেয়ে কিংবা বই পড়ে কী হবে? কই তরতাজা ৪টি শিশুর নিষ্ঠুর মৃত্যু সম্পর্কে কোনো কথাই তো হলোনা ১৮ ফেব্রুয়ারি বই মেলার আলোচনা-অনুষ্ঠানে!
অথচ, এদিন আমরা এদেশের এবং বিদেশের পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য মিডিয়া মারফতে অবগত হই যে, হবিগঞ্জের একটি বালু মহালে স্থানীয় ৪টি শিশুর লাশ উদ্ধার হয়! ওই নিষ্পাপ শিশুগুলোকে কী কারণে, কে-বা কারা হত্যা করলো,তার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেনি তাৎক্ষণিকভাবে। সেখানকার পুলিশ বিভাগ এক লক্ষ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করেছে ওই শিশু-হত্যাযজ্ঞের রহস্য উদঘাটনের জন্য। আর, এ থেকে আমরা বুঝতে পারছি, পুলিশ কোনো ‘ক্লু’ পাচ্ছে না বলেই পুরষ্কার ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
আমাদের বইমেলা বিশের মধ্যে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ বলে গর্ব আছে। এর আকার এবং প্রকৃতি অনন্য-বৈশিষ্টপূর্ণ। মাতৃভাষা সংগ্রামের মহিমান্বিত রূপ বাংলা একাডেমির এই বইমেলা। কিন্তু আমি হয়তো বোকার মতো ভাবি: বাঙলা-মাতৃভাষা সংগ্রামের সাথে খৃষ্টীয় সনের ফেব্রুয়ারি মাসের সম্পর্কটা কী? তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা আমাদের মাতৃভাষা বাঙলাকে অবজ্ঞা করে উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে আমরা এই পূর্ব বাংলার (আজকের বাংলাদেশে) মানুষরা মাতৃভাষা‘বাংলার’পক্ষে জীবনপন সংগ্রামে লিপ্ত হই এবং ১৩৫৮ বাংলা সনের ৮ই ফাল্গুন মোতাবেক খৃষ্টীয় ১৯৫২ সনের ২১ শে ফেব্রুয়ারি রফিক,শফিক,সালাম,বরকত,জব্বাররা শাসকগোষ্ঠির গুলিতে নিহত হন। তাঁদের জীবনদানকে আমরা শহীদী মর্যাদায় অভিষিক্ত করি। অত:পর সেই মহান স্মৃতি সুরক্ষায় আমরা “শহীদ বেদী” নির্মাণ করি জাতীয়ভাবে,সকল বিদ্যাপীঠে, সব জেলায়। আমরা সেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, জাত-পাত নির্বিশেষে সারিবদ্ধভাবে পরম মমতায় ফুল দিয়েভাষা-শহীদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার্পণ করে আসছি। কিন্তু, আমাদের অলক্ষ্যে, না-কি পরাজিত কোনো অপশক্তির চক্রান্তে মহান ৮ই ফাল্গুন দিনটি আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়,আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির সুরে-সুরে! আর এই অলক্ষ্য-অবস্থার মধ্যে ভোরবেলার পরিবর্তে রাত ১২টা ১ মিনিটে শহীদ বেদীতে ফুল দেয়ার প্রথা গড়ে ওঠে। প্রকৃত বিচারে যা খৃষ্টীয় রীতি বটে। (বাঙলা সনের দিনের সূচনা হয় সূর্যোদয়ের মধ্যে দিয়ে। আর খৃষ্টীয় সনের দিন গননা শুরু হয় রাত ১২:১ মিনিট থেকে)
রোমানদের কল্পিত দেবতা ‘ফেব্রুস’ এর নামে ফেব্রুয়ারি মাসের নাম করণ হয়েছে। অনুরূপভাবে দেবতা ‘জানুস’ রনামে জানুয়ারি, জুনোর নামে জুন,ইত্যাদি নামকরণ তারা করেছে তাদের কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় চেতনাকে স্থায়ী সুরক্ষা দেয়ার জন্য। তা পালনের দায় আমরা নিয়েছি কেন? ভাষা-শহীদদের স্মরণে ৮ই ফাল্গুন নিয়ে মনমাতানো একটি গান রচনার প্রতিভা কি কোনো বাঙালির ছিলো না? আমার মনে হয়, আমরা ভুল করেছি, এখনো করছি। এ ব্যাপারে সংশোধনী একান্ত প্রয়োজন। আমরা কিন্তু অবশ্যই হারিয়ে যাবো, যদি না সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসকে সুরক্ষাদিতে পারি। আমাদের বে-ভুলা হওয়ার মাত্রাটা চোখেপড়ে “০২-০২-২০১৬ ইং”এরূপ তারিখ লিখতে দেখি যখন। আদতে ‘ইংরেজি সন’ বলতে কিছু নেই। আর বাংলা সন সেতো আমরা এমনভাবে হারিয়েছি যে, ক্যালেন্ডারের মোটা ইংরেজি হরফের নিচে চোখ ফুটিয়ে ছোট্ট হরফের বাংলাকে খুজে বের করে “দিন-তারিখ” আত্মস্থ করতে হয়! আমি যখন মাঝে মধ্যে নারায়ণগঞ্জ যাই, তখন ফতুল্লাহ থানার নিকটবর্তী হলে জ্ঞানতাপস ফতেউল্লাহ সিরাজীর নাম মনে পড়ে। যিনি মাহমতি সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাঙলা সন প্রবর্তণের গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। কই, আমাদের ‘মহানএকুশের’ বইমেলায় এ সম্পর্কে আছে কোনো কথা?
এবার একটু নজরুল মুখোহই। বাঙালির স্বাধীনতা স্বপ্নকে যিনি ধাপে-ধাপে হাজির করেছেন সকল লড়াই-সংগ্রামে এবং সর্বোতভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে। সুহৃদ পাঠক, লক্ষ্য করুন, বৃটিশামলে ১৯২৬ সালে“হিন্দু-মুসলিমযুদ্ধ”শিরোনামের কবিতায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তোদের-ই আঘাতে পড়িছে তোদের মন্দির-মসজিদ/ পরাধীনদের কলুষিত করে উঠেছিল যার ভিত / খোদা খোদ যেন করিতেছে লয়, / পরাধীনদের উপাসনালয় / স্বাধীনহাতের পূত মাটি দিয়া রচিবে বেদী-শহীদ / টুটিয়াছে চুঁড়া? ওরেÑঐ সাথে টুটেছে তোদের নিদ!’ কী, আশ্চর্য্য ব্যাপার মনে হচ্ছে না? হ্যাঁ, এরই নাম নজরুল-প্রত্যয় এবং আমি স্পষ্ট বলতে চাই, আমাদের মহান ভাষা-সংগ্রাম, স্বাধীনতা এবং অপরাপর গৌরবময় অর্জন সমূহের রূপকল্প কাজী নজরুল ইসলাম নানামুখি রচনার মাধ্যমে বাঙালি জাতির সামনে অকপটে হাজির করেন। আর, বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে সে সবের সার্থক বাস্তবায়ন ঘটেছে ধাপে ধাপে।
আমাদের বিশেষভাবে স্মরণে রাখা দরকার, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে ছাড়া যেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে এসে মাত্র ৪ মাস ১৪ দিন পর ১৯৭২ সালের ২৪মে বিপর্যস্ত-বিদ্ধস্ত অবস্থায় কবি নজরুলকে বাংলাদেশে এনে জাতীয় কবির মর্যাদায় সমাসীন করেন। এর কারণ বা মাজেজা বুঝতে আমাদের বেশ সময় লাগলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চেতনায়, অস্থি-মজ্জায় এবং ধমনিতে তা ছিলো সদা-জাগরুক ও প্রবাহমান।
এবারের বইমেলা নিয়ে প্রথমশ্রেণির একটি জাতীয় দৈনিকে সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন ‘জঙ্গলে গাছ দেখা যায় না’। অর্থাৎ যা কিছু সারবস্তু বা কল্যানকর- তা ডেকে যাচ্ছে আসার আবর্জনার ভীড়ে। লেখাটি আমার খুবই ভালো লেগেছে। তবে আমার আজকের কথাগুলো ইতিহাসের কাছে নালিশ-স্বরূপ। এখানে আমি প্রস্তাবনা আকারে তিনটি বিষয় বর্তমান সরকারের নজরে নিতে চাই : এক. মহান ভাষা-আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সোপান এবং শহীদ বেদী আমাদের প্রথম জাতীয় প্রতীক। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা বিতর্ক নেই। অতএব যাঁরা ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন তাঁরা “মুক্তিযোদ্ধা” মর্যাদা পেতে আইনতঃ হকদার; এবং এটি তাঁদেরকে দিতে হবে। দুই. ভাষা শহীদদের “প্রথম মুক্তিযোদ্ধা” অভিধায় উপযুক্ত খেতাব এবং তাঁদের পরিবার প্রজন্মের দায়িত্বভার সরকারকে নিতে হবে। তিন. ইউনেস্কো ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস “২১শে ফেব্রুয়ারি” যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের পাশাপাশি মহান ৮ই ফাল্গুনকে ‘পুনর্জ্জীবন’ দিতে হবে; অর্থাৎ বাঙলা মাতৃভাষা সংগ্রামের মাইফলক দিনটি হবে ৮ই ফাল্গুন। লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, অঙ্গীবীনা





নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা : সামাজিক বাস্তবতা ও উত্তরণের পথ
স্বাধীন রাজনৈতিক শ্রেণী হিসাবেই শ্রমিকশ্রেণীকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে : বহ্নিশিখা জামালী
গৌতম বুদ্ধের প্রধান তিনটি ঘটনাকে বুদ্ধ পূণিমা অভিহিত করা হয়
বাঙ্গালির জীবনে বাংলা নববর্ষ ও কিছুকথা
পাহাড়ের বৈচিত্র্যে মানবিক ঐক্যের সুর: বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-চাংক্রান
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দীপেন দেওয়ান ও মীর হেলালের নিয়োগ ক্ষমতার ভারসাম্য : পাহাড়ী-বাঙালি বিভেদ থাকবে না
আজ ঐতিহাসিক পাকুয়াখালী গণহত্যা দিবস
গৌতম বুদ্ধের ছয়টি স্মৃতি বিজড়িত আষাঢ়ী পূর্ণিমা
পাহাড়ে নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তির সাতরঙা উৎসব : মো. রেজুয়ান খান
সিয়াম সাধনার পুরস্কার : ঈদুল ফিতরের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য