শনিবার ● ১৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রথম পাতা » উপ সম্পাদকীয় » বাঙ্গালী জাতির সার্বজনীন মিলন উৎসবে পরিনত হলো শারদীয় দূর্গাপূজা
বাঙ্গালী জাতির সার্বজনীন মিলন উৎসবে পরিনত হলো শারদীয় দূর্গাপূজা
উত্তম কুমার পাল হিমেল :: সার্বজনীন শারদীয় দূর্গোৎসব বাঙ্গালী হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ গুরুত্বপূর্ন ও ধর্মীয় সামাজিক উৎসব। প্রতিবছর শরতকাল এলেই বাঙ্গালীঁ জাতি মেতে উঠেন দূর্গাপূজার এই উৎসবের আমেজে। ধর্মীয় এক হৃদয় নিংড়ানো মিলন মেলায় পরিনত হয় এই উৎসব। আর এই উৎসবের উৎসে অধিষ্টিত হিন্দু পুরানের অন্যতম দেবী হলেন দূর্গা। পৌরনিক কাহিনী অনুসারে দেবী দূর্গাই হলেন শিবের স্ত্রী পার্বর্তী। লক্ষী,সরস্বতী,গনেশ ও কার্তিকের জননী তিনিই। কিন্তু কেন শিবজায়া পার্বর্তীর নাম দেবী দূর্গা হল। স্কন্দপুরানের বর্ননা অনুসারে রুরু দৈত্যর পুত্র দূর্গকে বধ করিেছলেন বলেই পার্বতীর নাম হয়েছে দেবীদূর্গা। তবে বাঙ্গালীর দূর্গোৎসবে দেবী কিন্তু স্কন্দপুরানের বর্ননামতে দূর্গাসুর বধকারী রুপে তিনি পূজিত নন। এখানে তিনি পূজিত হন মহিষাসুর মর্দিনী রুপে। দেবী দূর্গার এই আবির্ভাবের পরিচয় পাওয়া যায় মার্কন্ডেয় পুরানে। ভাগবত পুরান অনুসারে ব্রম্মার মানস পুত্র মনু পৃথিবীর শাসনভার পেয়ে ক্ষীরোদ সাগরের তীরে মৃম্ময়ী মুর্তি নির্মান করে দেবী দূর্গার আরাধনা করেন। মার্কন্ডেয় পুরান মতানুসারে প্রথম এই দুগোৎসবের আয়োজন করেন রাজা সুরথ। আর রাজা সুরথ এই দূর্গাপূজা করেছিলেন বসন্তকালে। সেই পূজা অনুসরন করে পৃথিবীর কোন কোন স্থানে দুগোৎসবের আয়োজন করা হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে দূর্গাপূজা জনপ্রিয় সময়টা হল শরতকাল। শুরুতে শরতকালে দুগোৎসব করেছিলেন শ্রী রাম চন্দ্র। কৃর্তিবাস রামায়ন অনুসারে রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে লংকাধিপতি রাবন আকুল সুরে দেবীর স্তব শুরু করলেন। রাবনের কাতর স্তবে দেবীর হৃদয়ে করুনার উদ্রেক হল। রাবনকে অভয় দিলেন তিনি। সম্পূর্নরুপে অনাকাংখিত এই খবরে খুুব শংকিত হলেন রাামচন্দ্র। দেবতার এ খবরে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। দেবরাজ ইন্দ্র ব্রম্মার কাছে গেলেন। এই সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে পরিত্রান পাবার জন্য ব্যবস্থা গ্রহনের জন্যণ অনুরোধ জানালেন ব্রম্মাকে। ব্রম্মা রামের কাছে গিয়ে দূর্গা পূজা করার জন্য আবহান জানালেন। দূর্গাপূজাই হল এই সংকট থেকে পরিত্রানের একমাত্র উপায়। কিন্তু বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের দূর্গাপূজা সাধারনত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ট দিন ষষ্টী থেকে দশম দিন অর্থাৎ বিজয়া দশমী দিন পর্যন্ত পাচঁদিন অনুষ্টিত হয়। এই পাচঁটি দিনের পূজা যথাক্রমে দূর্গষষ্টী, মহাসপ্তমী, মহাঅষষ্টী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। দূর্গাপূজা এই পাচঁদিনসহ সমগ্র পক্ষটিকে দেবীপক্ষ নামে আখ্যায়িত করা হয়। আর দেবী পক্ষের সূচনা হয় পূর্ববর্তী অমাবশ্যার দিন থেকে। এই দিইট “মহালয়া” নামে পরিচিত। অন্যদিকে দেবীপক্ষের সমাপ্তি হয় পঞ্চদশ দিন অর্থাৎ পূর্ণিমায়। এই দিনটি কোজাগরী পূর্ণিমা নামে পরিচিত এবং বার্ষিক লক্ষীপূজার দিন হিসাবেও গন্য হয়। দূর্গাপূজা মূলত পাচঁ দিনের অনুষ্টান হলেও মহালয়া থেকেই প্রকৃত উৎসবের সূচনা হয় এবং কোজাগরী লক্ষীপূজার মাধ্যমে হয় তার সমাপ্তি। বাংলাদেশে দূর্গোৎসবের বহুল প্রচলিত রুপ অর্থাৎ মহিষাসুর মর্দিনীর পূজার উল্লেখ পাওয়া যায় মার্কন্ডেয় পুরানে। মূল পুরানটি চতুর্থ শতাব্দিতে রচনা হলেও দূর্গাপূজা বিবরন সম্বলিত সপ্তশতীতে রয়েছে ৯ম-১২শ শতাব্দির মধ্যকার সময়ের নির্মিত একাধিক মহিষাসুর মর্দিনীর মুর্তিও। তবে সেই সব মুর্তিতে মহিষাসুর মর্দিনী কিন্তু পরিবার সমন্বিতা নন। উপমহাদেশে জমিদারী প্রথা বিলোপের পর শারদীয় দূর্গপূজায় জমিদারদের অংশ গ্রহন স্বাভাবিক ভাবেই অনেকটা কমে যায়। নব্য ধনীক শ্রেনীর উদ্ভবের পরিপ্রেক্ষিতে দূগোৎসব আয়োজক কমিটিতে যুক্ত হয় অনেক নতুন নতুন মূখ। তবে প্রতিটি দুর্গোৎসবই তখনকার সময় আয়োজিত হত সম্পূর্ন একক উদ্যোগে। আনুমানিক ১৭৯০ খ্রীষ্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার গুপ্তিপাড়ায় ঘটে একটি উল্লেখ যোগ্য ঘটনা।
গুপ্তিপাড়ার একটি ধনী পরিবারের আকস্মিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে অনিশ্চয়তার সন্মূখীন হয় ঐ বাড়ীটির বাৎষরিক দূর্গাপূজার আয়োজন। তখন গুপ্তি পাড়ায়ার ১২ জন বন্ধু মহলের যুবক এগিয়ে আসেন যৌথ উদ্যোগে দূর্গাপূজা পালন করার জন্য। এই ১২ জন ইয়ার বা বন্ধু সংঘবদ্ধভাবে গ্রহন করে দূর্গাপূজা পালনের সার্বিক দায়িত্ব। আর গুপ্তিপাড়ার এই পূজাটি মানুষের কাছে পরিচিত হয় “বারোইয়ারী” বা বারোয়ারী বা সার্বজনীন পূজা নামে। এই বারোয়ারী পূজার সুত্র ধরে একক উদ্যোগে সম্পাদিত দুর্গাপূজাই আজ পরিনত হল সার্বজনীন শারদীয় উৎসবে। ধনী ও বিত্তশালীদের আঙ্গিনা থেকে দূর্গাপূজা নেমে এলো অনেকটা সাধারন মানুষের সাধ্যের মাঝে। গুপ্তিপাড়ার আদর্শ অনুসরন করে সম্মিলিত উদ্যোগে বারোয়ারী পূজা ছড়িয়ে পড়ল ভারতীয় উপমহাদেশসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের এই নৈকট্য সাধারন মানুষকে সাহস জোগালো র্দূগাপূজা মতো সর্ববৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্টানে বিত্তশালীদের একচেটিয়ে অধিকারে ভাগ বসানোর। ব্যক্তি বা বারোয়ারীর সীমা ছাড়িয়ে দূর্গাপূজা আজ পরিনত হল সার্বজনীন শারদীয় উৎসবে। ভারতবর্ষে বৃট্রিশ বিরোধী আন্দোলন যখন জোরদার হয়ে উঠল তখন মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র বিপ্লবের পথে স্বাধীনতা অর্জনের প্রচেষ্টাও চলল সমানে তালে । ইংরেজদের নজর এড়াতে দুর্গোৎসবকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে লাগল বিপ্লবীরা। ধর্মীয় অনুষ্টানে ছদ্মাবরনে বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষকে সংঘবদ্ধ করার একমাত্র উপায় হল এই শারদীয় দূর্গাপুজা। কালের পরিক্রমায় ব্রিট্রিশ শাসনের অবসান হল। বিভাজিত হয়ে পড়ল অবিভক্ত বাংলা। পাকিস্থান অপশাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে বিভাজিত বাংলার পুর্বাঞ্চল রুপান্তরিত হল বাংলাদেশ নামের একটি নতুন স্বাধীন রাষ্টে। আর বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের অসাম্প্রদায়িক প্রবনতা শারদীয় দূর্গাৎসবকে আজ পরিনত করল প্রকৃত অর্থেই বাঙ্গলীর সার্বজনীন উৎসবে। বছর ঘুরে এই সার্বজনীন দূর্গাপূজা এলেই বাঙ্গালী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মেতে উঠেন এক আনন্দ উৎসবের আমেজে। এই প্রানবন্ত আমেজ সমাজের সকল অসুর শক্তির বিনাশ সাধন করে সকল মানুষের মাঝে শান্তির বার্তা বয়ে আনুক। এটাই হোক সার্বজনীন শারদীয় দুর্গা পূজার ঐক্যবদ্ধ প্রার্থনা।
লেখক : উত্তম কুমার পাল হিমেল
সাধারন সম্পাদক
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ,নবীগঞ্জ উপজেলা শাখা হবিগঞ্জ।
নবীগঞ্জে আদিত্যপুর ঠাকুরবাড়িতে শারদীয় উৎসবের শতবর্ষ পূর্তি পালনে বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান
স্টাফ রিপোর্টার :: নবীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের আদিত্যপুর ঠাকুরবাড়ি দুর্গা পূজার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে ১৭ অক্টোবর শনিবার রাতে সপ্তমীতিথির পূজাশেষে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পূজা আয়োজক কমিটির শ্যামল চক্রবর্তী,পংকু চক্রবর্তী, স্বর্গীয় রিংকু চক্রবর্তী, পিংকু চক্রবর্তীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং ওস্তাদ দ্বীপেন্দ্র দাশ ও ওস্তাদ রাখাল দাশের পরিচালনায় এতে সংগীত পরিবেশন করেন লীলা পদ দাশ,ফুলন সুত্রধর,মুন্নী দাশ,তুলি রায়,সেজুতি পাল,স্নেহা রায় মেঘলাসহ অন্যান্য শিল্পীবৃন্দ। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন নবীগঞ্জ উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নারায়ন রায়, সাধারণ সম্পাদক ও নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক নির্বাচিত সভাপতি উত্তম কুমার পাল হিমেল,উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সহ সভাপতি অঞ্জন পুরকায়স্থ, ইউনিয়ন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদপর সভাপতি জয়ন্ত দাশ, উপজেলা সৎসঙ্গের নির্বাহী সদস্য সুব্রত কুমার দাশ, ইউপি সদস্য মোঃ ইসমত মিয়া,দিলীপ গোপ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে প্রচুর ভক্তবৃন্দের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।





মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী পাঁচগাঁওয়ের দুর্গা পূজা ও কিছু কথা
মহালয়ার আদ্যপান্ত : ভিন্ন দৃষ্টিকোণ
নিখোঁজ শিশুর অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎ : আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা জরুরী
কৃষকের যত চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের ঘোষিত ছয় অগ্রাধিকার
নেপালের বন্যা: সীমান্তের ঊর্ধ্বে এক সংকট
জলবায়ু পরিবর্তনের অদৃশ্য সংকট ও পরিণতি
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা : সামাজিক বাস্তবতা ও উত্তরণের পথ
স্বাধীন রাজনৈতিক শ্রেণী হিসাবেই শ্রমিকশ্রেণীকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে : বহ্নিশিখা জামালী