রবিবার ● ৪ জানুয়ারী ২০২৬
প্রথম পাতা » ঢাকা বিভাগ » আরিচা ঘাটের সেকাল আর একাল
আরিচা ঘাটের সেকাল আর একাল
উত্তম কুমার পাল হিমেল,মানিকগঞ্জ আরিচাঘাট থেকে ফিরে :: এক সময়ের কোলাহলপূর্ণ ও কর্মমুখর মানিকগঞ্জের আরিচাঘাটের চিত্র কালের আবর্তে যেন অনেকটাই বদলে গেছে । নেই আর আগের মতো মানুষের আনাগোনা ও দূরপাল্লার মালামাল পরিবহনের ব্যস্থতাও । প্রেস ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ পিআইবির অধীনে একটি টীম গত ১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার দিনব্যাপী সরেজমিন প্রতিবেদনে এমনটাই জানা গেছ।
এলাকাবাসীর বরাতে জানাযায়, ষাটের দশক থেকে হাজার হাজার যাত্রী ও শত শত গাড়ির সমাগম ঘটত ঢাকার অদূরবর্তী মানিকগঞ্জ আরিচা ঘাটে । লঞ্চ ও ফেরির হুইসেল এবং মানুষের চলাচলে আরিচা ঘাট ছিল এক সময় কোলাহল ও কর্মমুখর । হকার ও ফেরিওয়ালাদের হইহুল্লোড় ও হাঁকডাকে সরগরম থাকত পুরো ঘাট এলাকা । দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের রাজধানীতে যাতায়াতের একমাত্র পথ ছিল আরিচা ঘাট । এ ঘাটকে ঘিরেই সে সময় থেকেই গড়ে ওঠে ব্যবসাকেন্দ্র । হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বোর্ডিংয়ের ব্যবসাও ছিল জমজমাট । অনেকের জীবন–জীবিকা নির্বাহ হতো এ ঘাটকে ঘিরে । লাল বাহিনী ও সাদা বাহিনী—দুটি দলে সহস্রাধিক কুলির সংসার চলত এ ঘাটের আয়ে উপর ।
এরও আগে ব্রিটিশ আমলে আরিচায় ছিল পাটের বড় গুদাম। স্টিমার (জাহাজ) ও ছান্দিনৌকায় (বিশালাকৃতির নৌকা) করে এ ঘাট থেকে পাট কিনে কলকাতায় নিয়ে যেতেন ব্যবসায়ীরা। তবে সময়ের পরিবর্তনে আরিচা ঘাটের সেই কর্মচাঞ্চল্যতা এখন আর নেই। কালের বিবর্তনে আরিচা ঘাট হারিয়েছে তার জৌলুশ ও সৌন্দর্য । সে সময়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল ও বোর্ডিংগুলো বন্ধ হওয়ায় কুলি, ফেরিওয়ালাসহ অসংখ্য মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। এখন চিরচেনা সেই আরিচা ঘাট শুধুই যেন স্মৃতি। নামেমাত্র কিছু যাত্রী আর পণ্য চলাচল করলেও আরিচা ঘাটের সেই নানা স্মৃতি আজও গেঁথে আছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় যুমনা নদীর পূর্ব পাড়ে গড়ে ওঠে আরিচা ঘাট। জেলা সদর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার পশ্চিমে এ ঘাটের অবস্থান।
যেভাবে গড়ে ওঠে আরিচা ঘাটঃ স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমল থেকেই স্টিমার ও জাহাজে করে কলকাতা থেকে বিভিন্ন পণ্য আসামে আনা–নেওয়া করা হতো। যাত্রাপথে এসব স্টিমার ও জাহাজ আরিচা এলাকায় ভিড়ত। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষিপণ্য, বিশেষ করে পাট কলকাতায় নিয়ে যেতেন ব্যবসায়ীরা। নৌপথে চলাচলে সহজ, একমাত্র মাধ্যম ও সাশ্রয়ী হওয়ায় ঘাট কেন্দ্রিক ব্যবসা–বাণিজ্য গড়ে ওঠে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে আরিচা এলাকায় যমুনা নদীর পাড়ে বড় বড় স্টিমার ও জাহাজ ভিড়ত। পরবর্তী সময়ে ঘাটে গড়ে উঠেছিল পাটের বিশাল গুদাম। সে সময় থেকেই আরিচা ঘাটের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।
ব্রিটিশ আমলে কলকাতা নৌবন্দর থেকে বড় বড় জাহাজে পণ্য বোঝাই করে আসামে যাতায়াতের পথে আরিচায় নোঙর করত। এখানে জাহাজের চালকদের বদলির কেন্দ্র ও তাঁদের আবাসস্থল ছিল।
তবে বর্তমানে এ ঘাটের চিত্র অনেকটা বদলেছে। যমুন নদীর ভাঙনে মূল আরিচা ঘাট বিলীন হওয়ায় নদীর কিছুটা পূর্ব পাড়ে ধীরে ধীরে ঘাটটি স্থানান্তর করা হয়।
নদী বন্দরের স্বীকৃতিঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ১৯৬৩ সালের ৩১ মার্চ কর্ণফুলী নামের একটি ফেরি দিয়ে মানিকগঞ্জের আরিচা এবং পাবনার নগরবাড়ি নৌরুটের যাত্রা শুরু হয়। এর পর থেকে আরিচা-নগরবাড়ি ও আরিচা-গোয়ালন্দ (বর্তমানে দৌলতদিয়া) নৌপথে ফেরি চলাচল শুরু হয়। ১৯৬৪ সালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক চালু হওয়ার পর আরিচা ঘাট জমজমাট হতে থাকে। আরিচা-নগরবাড়ি হয়ে ওঠে দেশের উত্তরাঞ্চল এবং আরিচা-গোয়ালন্দ হয়ে ওঠে দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের সড়ক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আরিচা কার্যালয় সুত্রে জানাযায়, সরকারি গেজেট হওয়ার পর ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই নৌবন্দরের স্বীকৃতি পায় আরিচা ঘাট। এটি হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম নদীবন্দর। আরিচা ঘাট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার যানবাহন পারাপার হতো। প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার মানুষের যাতায়াত ছিল।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের ভাষ্য, ফেরি সার্ভিস চালু হলে আরিচায় গড়ে ওঠে দুটি বড় ট্রাক টার্মিনাল, যার ধারণক্ষমতা এক হাজার ট্রাকের। যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের চাপে যানজট ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। যানজটের মাত্রা এতই বেশি ছিল যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো যাত্রীদের। আর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস পারাপার করা হলেও তিন থেকে চার দিন পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে আরিচা ঘাটের ট্রাক টার্মিনালে অপেক্ষায় থাকতে হতো। যানজটের মাত্রা এতই ভয়াবহ ছিল যে ঈদের ছুটির সময়ে ঈদের নামাজ ঘাটে পড়ার ঘটনাও আছে অসংখ্য।
ঘাট ঘিরে ব্যবসাঃ ব্রিটিশ আমলেই আরিচা ঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠে। সে সময় আরিচা ঘাট এলাকায় পাটের গুদাম ও ঢেউটিনের গুদাম ছিল। মানিকগঞ্জ ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত এসব পাট আরিচায় গুদামে রাখা হতো। এ ছাড়া পাশের ঘিওর উপজেলায় বড় বড় পাটের গুদাম ছিল। ঘিওরের এসব গুদাম থেকে বড় বড় নৌকায় করে পাট আরিচায় আনা হতো। এরপর সেখান থেকে এসব পাট কলকাতায় নিয়ে যেতেন ব্যবসায়ীরা।
উপজেলার তেওতা একাডেমির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অজয় চক্রবর্তী (৭০) জানান, ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় ভূপাল দেবনাথ নামের এক পাট ব্যবসায়ী আরিচা ঘাট এলাকায় পাটের গুদাম তৈরি করেন। তিনি দেশের উত্তরবঙ্গের পাটকলগুলোয় পাট বিক্রি করতেন। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পাটের গুদাম গুটিয়ে তিনি ভারতে চলে যান।
নদীবন্দর হওয়ায় অসংখ্য মানুষ ও যানবাহনের আনাগোনায় আরিচা ঘাট এলাকায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ঘাটে আটকে থাকায় যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের জন্য গড়ে ওঠে শতাধিক হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বোর্ডিং। দুই থেকে তিন দিন ঘাটে আটকে থাকতে হলে তাঁরা এসব বোর্ডিংয়ে রাত যাপন করতেন।
ঘাটে একসময় মোহাম্মদিয়া হোটেল অ্যান্ড বোর্ডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল শিবালয়ের সাকরাইল গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত খলিলুর রহমানের। তাঁর ছেলে ফরিদ হোসেন বলেন, আরিচা ঘাটের যখন পুরো ‘যৌবনকাল’, সে সময়ে জমজমাট ছিল হোটেল ও বোর্ডিংয়ের ব্যবসা। ঘাটের অপেক্ষমাণ যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের রাতযাপনের জন্য প্রায় অর্ধশত হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বোর্ডিং পরিপূর্ণ থাকত।
স্থানীয় অন্বয়পুর গ্রামের বাসিন্দা রঘুনাথ বিশ্বাস (৬৭) বলেন, ১৯৬৮ সাল থেকে তাঁর বাবা বিশ্বনাথ বিশ্বাস নওগাঁসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে ধান ও চাল কিনে ছান্দিনৌকায় করে আরিচা ঘাটে নিয়ে আসতেন। পরে এসব ধান ও চাল মানিকগঞ্জে বিক্রি করতেন। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তাঁদের এই ব্যবসা ছিল।
আরিচাঘাটের মুদি ব্যবসায়ী মোতালেব হোসেন(৭০) বলেন,৪০ বছর ধরে এখানে আছি । আরিচাঘাট থেকে কাজিরহাট ভাড়া ৯০ টাকা। ওপার শাহাজাদপুর থেকে পাবনা ট্রলার চর এলাকায় এখন মানুষ আর আগের মতো যাতায়াত করে না।
ঘাট এলাকায় ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের মালামাল বহন করতেন কুলিরা। কুলিদের মধ্যে দুটি দল ছিল। একটি লাল বাহিনী, অপরটি সাদা বাহিনী। ১৯৭২ সালের দিকে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রশিদ ওরফে লেবু কুলি শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তোলেন। পাঁচ শতাধিক কুলি যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের মালামাল ফেরি ও নৌকায় ওঠাতেন ও নামাতেন।
বদলেগেছে দৃশ্যপটঃ আরিচা ঘাট বা বন্দরের সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর নেই । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরিচার চিত্র পাল্টেছে । ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর আরিচা ঘাটের গুরুত্ব কমে যায়। যমুনা নদীতে নাব্যতা–সংকটের কারণে ২০০২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আরিচা ফেরিঘাট স্থানান্তর করা হয় পাটুরিয়ায়। হারাতে থাকে তার চিরচেনা সেই রূপ।
ঘাট সরিয়ে নেওয়ায় আরিচায় যাত্রী ও যানবাহনের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যায়। একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর আরিচা ঘাটে এখন অনেকটাই সুনশান নীরবতা। একে একে সব হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বোর্ডিং ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। বেকার হয়ে পড়েন শত শত কুলি ও ফেরিওয়ালা। তবে বর্তমানে এখানে কোন চাঁদাবাজি নাই বলে জানান স্থানীয়রা।





বেগম খালেদা জিয়ার শোকবইয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর
ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা
টিমওয়ার্ক ও একাগ্রতাই আমাদের সাফল্যের চাবিকাঠি : পানাম গ্রুপের এমডি
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির শোক
সাইফুল হক ঢাকা-১২ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন
এশিয়ায় তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে
রিহ্যাব মেলায় আশিয়ান সিটির চমক: বিনিয়োগে কয়েক গুণ মুনাফা ও আধুনিক আবাসনের নিশ্চয়তা
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী অনুমোদনে অভিনন্দন
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনায় না নিয়ে দূর্বৃত্ত সন্ত্রাসীসের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নিন