বৃহস্পতিবার ● ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রথম পাতা » মুক্তমত » স্মৃতির ক্যানভাসে বিলুপ্তির সুর, সময়ের গহীনে সোনালী ভোর
স্মৃতির ক্যানভাসে বিলুপ্তির সুর, সময়ের গহীনে সোনালী ভোর
![]()
হাফিজ মাওলানা ডা. হাফিজুল ইসলাম লস্কর :: সময়ের চাকা ঘোরে, আর সেই চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে বদলে যায় চেনা দিগন্ত। আধুনিকতার চকমকে আলো আর প্রযুক্তির তীব্র গতি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে সত্য, কিন্তু সেই গতির ঝড়ে আমাদের অজান্তেই হাতছাড়া হয়ে গেছে গ্রামীণ বাংলার হাজার বছরের চেনা ঐতিহ্য আর মায়াবী কিছু অনুষঙ্গ। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, আমরা কি শুধুই এগিয়েছি, নাকি হারিয়েছি আমাদের আত্মাকে?
একসময় গ্রামবাংলার ভোরের আলো ফুটত ঢেঁকির ‘পড়াত পড়াত’ শব্দে। সেই শব্দের সাথে মিশে থাকত মায়ের হাতের ভাপা পিঠার সুবাস। আজ সেই ঢেঁকি আর উখল কেবলই যাদুঘরের শোভাবর্ধনকারী বস্তু। কৃষকের কাঁধে লাঙ্গল-জোয়াল আর মাঠের কোণে খড়ের মরাই, যা ছিল একসময় বাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক। তা বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। আধুনিক ট্রাক্টর আর যান্ত্রিক হারভেস্টারের যুগে লাঙ্গল-জোয়াল আজ শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দি।
শৈশবের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধুলোবালি মাখা কিছু সোনালী দুপুর। কোথায় হারিয়ে গেল সেই এক্কাদোক্কা, ডাঙ্গুলি আর হা-ডু-ডু খেলার দিনগুলো? বর্ষার দুপুরে সুপারি পাতার গাড়িতে চড়ে ঘোরার যে আনন্দ, কিংবা তালপাতার বাঁশি বাজিয়ে পুরো পাড়া মাথায় তোলার যে নিখাদ সুখ, তা যান্ত্রিক সময়ের ভিডিও গেম বা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হওয়া প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারবে না। কাগজের নৌকা বানিয়ে বৃষ্টির পানিতে ভাসিয়ে দেওয়ার সেই টানটান উত্তেজনা আজ ডাস্টবিনের আবর্জনার মতোই হারিয়ে গেছে।
সন্ধ্যা নামলেই যে গ্রামগুলো মেতে উঠত কুপি, হারিকেন কিংবা লণ্ঠনের মৃদু মায়াবী আলোয়, আজ সেখানে জ্বলজ্বল করে বিদ্যুতের আলো। লোডশেডিংয়ের রাতে এখনো হয়তো মোমবাতি জ্বলে, কিন্তু উঠোনে মাদুর বা শীতলপাটি পেতে হাতপাখার বাতাস খেতে খেতে দাদীর মুখে রূপকথার গল্প শোনার সেই আবহ কি আর ফিরে পাওয়া সম্ভব? কাঁসা-পিতলের থালা-বাসন কিংবা মাটির কলসির ঠান্ডা জলের জায়গা নিয়েছে প্লাস্টিকের বোতল আর রেফ্রিজারেটর। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জীবন যান্ত্রিক হয়েছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই স্নিগ্ধতা।
এমনকি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার আনন্দটাও বদলে গেছে। পালকি, টমটম বা গরুর গাড়ির সেই ধীরস্থির যাত্রা আজ ইতিহাসের অংশ। নদীর বুকে পালতোলা নৌকার রঙিন পাল কিংবা সাম্পানের সেই অপরূপ দৃশ্য এখন কেবলই ছবির ফ্রেমে বন্দি। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বায়োস্কোপের ভেতর অন্য এক জগৎ দেখার সেই বিস্ময়, পুতুল নাচ, লাঠি খেলা কিংবা মেঠো সুরের জারি-সারি, যাত্রা ও পালাগান, সবকিছুই যেন আধুনিক বিনোদনের জোয়ারে ভেসে গেছে।
এই পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। যুগের প্রয়োজনে আমাদের আধুনিক হতে হবে, জীবনযাত্রায় আনতে হবে স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু তাই বলে কি আমরা আমাদের শিকড়কে ভুলে যাব? এই বিলুপ্তপ্রায় বস্তুগুলো কেবল কিছু জড় পদার্থ ছিল না, এগুলো ছিল আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য এবং আমাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আধুনিকতার এই জয়োৎসবে দাঁড়িয়ে ভীষণভাবে মনে পড়ে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে। যান্ত্রিকতার ভিড়ে আমাদের ঐতিহ্যগুলো হয়তো দৈনন্দিন জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু বাঙালি হৃদয়ের মণিকোঠায় এগুলোর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব চিরকাল অম্লান থাকবে। স্মৃতির ক্যানভাসে এই হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিনগুলো সবসময়ই এক দীর্ঘশ্বাসের নাম হয়ে বেঁচে থাকবে।
লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক ও ইউনানী চিকিৎসক।





দুর্গম পাহাড়ের এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর : সাংবাদিক আবদুর রহিম
ঐতিহ্যবাহী মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা
আন্তর্জাতিক ‘আদিবাসী’ দিবসকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত
সোনালী চিল
যোগ্যজন নির্বাচন এবং জাতীয় ভোটারদিবস-২০২৩
প্রধান শিক্ষককে ফিরে পেতে ছাত্র-ছাত্রীদের আকুতি
সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ভোট প্রদান নাগরিকের দায়িত্ব
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদের নামে ষড়যন্ত্র কুচক্রীমহলের